যে আকাশে বছরে ১৬০ রাত বিদ্যুতের ঝলকানি
কোথায় দেখা যায় এই বজ্রপাত? ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্রদের পশ্চিম দিকে, কাটাতুম্বো নদী যেখানে হ্রদে মিশেছে, সেই জলাভূমি অঞ্চলে বজ্রপাতের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় বারি জনগোষ্ঠীর ভাষায় ‘কাটাতুম্বো’ শব্দের অর্থ ‘বজ্রের ঘর’। গবেষণায় দেখা গেছে, বছরে প্রায় ১৪০ থেকে ১৬০ রাতে এই অঞ্চলে বজ্রঝড় হতে পারে। কোনো কোনো রাতে প্রায় নয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যায়। এক মিনিটে ১৬ থেকে ৪০ বার বজ্রপাতের ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বর্গকিলোমিটারে বছরে প্রায় ২৫০টি বজ্রপাত হতে পারে এখানে। এই কারণে কাটাতুম্বো পৃথিবীর অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। কেন একই জায়গায় এত বজ্রপাত? এই ঘটনার পেছনে রয়েছে বিশেষ ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়াগত পরিস্থিতি। মারাকাইবো হ্রদ ও আশপাশের জলাভূমি থেকে বাতাসে প্রচুর জলীয় বাষ্প মেশে। অন্যদিকে, আন্দিজ, পেরিজা ও মেরিডা পর্বতশ্রেণি ঘিরে রেখেছে অঞ্চলটিকে। হ্রদের ওপর তৈরি হওয়া উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে পর্বত থেকে নেমে আসা অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাসের সংঘাতে বায়ুমণ্ডল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এতে শক্তিশালী বজ্রঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ঝড়ের মেঘের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ জমে ঘন ঘন বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা দেয়। এসব বজ্রপাতের বড় অংশই মেঘের ভেতরে ঘটে। তবে ঠিক কী কারণে কাটাতুম্বোতেই এত নিয়মিত বজ্রপাত হয়, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, ঋতু পরিবর্তন এবং এল নিনোর মতো জলবায়ুগত প্রভাবও এই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। একসময় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো বজ্রপাত? কাটাতুম্বোতে সারা বছর একই হারে বজ্রপাত হয় না। ঋতু ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এর তীব্রতাও বদলায়। ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই অঞ্চলে বজ্রপাতের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে খরার প্রভাবকে বিবেচনা করা হয়েছিলো। তখন এই প্রাকৃতিক ঘটনা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলো কি না, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়। পরে আবার নিয়মিত বজ্রপাত দেখা যায়। গবেষকেরা মনে করেন, স্থানীয় বায়ুপ্রবাহ ও বৃহত্তর জলবায়ুগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে কয়েক মাস আগে বজ্রপাতের প্রবণতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। তবে নির্দিষ্ট কোনো রাতে কতটা বজ্রপাত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কেন বলা হয় ‘মারাকাইবোর বাতিঘর’? কাটাতুম্বো বজ্রপাতের ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। ঔপনিবেশিক আমলের বিভিন্ন বিবরণেও এর উল্লেখ রয়েছে। ১৮২৬ সালে প্রুশীয় প্রকৃতিবিদ ও অভিযাত্রী আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট এই প্রাকৃতিক ঘটনার বর্ণনা দেন। ১৮৪১ সালে ইতালীয় ভূগোলবিদ অগাস্টিন কোডাজ্জিও মারাকাইবো হ্রদের আশপাশে এই আলোর ঝলকানির কথা উল্লেখ করেন। দূর থেকে রাতের আকাশে এই আলো দেখা যেত বলে ঘটনাটি ‘মারাকাইবোর বাতিঘর’ নামেও পরিচিতি পায়। নাবিকদের কাছে এটি ছিল পরিচিত দৃশ্য। স্থানীয় ওয়ায়ু, ইউকপা ও বারি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও বিশ্বাসেও এই বজ্রপাতের বিশেষ স্থান রয়েছে। ভেনেজুয়েলার জুলিয়া রাজ্যের পতাকা ও প্রতীকেও বজ্রপাতের চিহ্ন রয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ, তবে ঝুঁকিও আছে রাতের অন্ধকারে হ্রদের ওপর একের পর এক বিদ্যুতের ঝলকানি, বিস্তীর্ণ জলরাশি ও আশপাশের জলাভূমি মিলে কাটাতুম্বোকে অনন্য করে তুলেছে। এই দৃশ্য দেখতে আগ্রহী পর্যটকদের কাছেও অঞ্চলটির বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। তবে বজ্রঝড়ের সময় খোলা জায়গা বা পানির কাছাকাছি অবস্থান করা বিপজ্জনক। তাই সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করলে স্থানীয় আবহাওয়ার পূর্বাভাস, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও অভিজ্ঞ গাইডের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি। ভূপ্রকৃতি, জলীয় বাষ্প ও বায়ুপ্রবাহের বিশেষ সমন্বয়ে কীভাবে প্রকৃতি এমন বিস্ময়কর দৃশ্য তৈরি করতে পারে, কাটাতুম্বো বজ্রপাত তারই এক অনন্য উদাহরণ। /শান্ত/