Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়, তবু বিনিয়োগে খরা
ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড়, তবু বিনিয়োগে খরা

অতীতে যেখানে দেশীয় উচ্চ সুদের বিকল্প হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ ছিলো সস্তা বিদেশি ঋণ, এখন ডলারের বিনিময় হারের ঝুঁকি ও ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সেই বিদেশি ঋণের প্রতিও তারা চরম অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন। এই দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ স্থবিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর। বাংলাদেশে টানা তিন বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে গত ৬ অক্টোবর বিশ্বব্যাংক তাদের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে মাত্র ৩.৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ) এই পূর্বাভাস আরও কমিয়ে ৩.২ শতাংশ করেছে। টানা তিন বছর ধরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংক খাত, কম রাজস্ব সংগ্রহ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের মন্দা সামাল দিতে দ্রুত সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছে বৈশ্বিক সংস্থাটি। তারা জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে উদ্ভূত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে আরও বাড়িয়েছে। এই অবস্থায় সংকট কাটিয়ে উঠতে দেশের নীতি-নির্ধারকদের করণীয় কী, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলে চলছে জোর আলোচনা। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সংস্থাটির কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম বলছেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে বাংলাদেশকে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংক খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে পরিবর্তন জরুরি। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা এবং আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরির জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। টানা ৫ মাস ৫ শতাংশের নিচে ঋণ প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি টানা ৫ মাস ধরে ৫ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই প্রবৃদ্ধি ১১ থেকে ১২ শতাংশের ঘরে থাকা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সাধারণ বিষয় ছিলো। ব্যবসায়ীরা নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন করছেন না, এমনকি চলমান কলকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজও স্থগিত রেখেছেন। ফলে, ব্যাংকগুলোতে আমানতের প্রবাহ ঠিক থাকলেও ঋণ হিসেবে বাজারে যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ, যা ব্যাংকগুলোর জন্য এক ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন এই বিনিয়োগ অনাগ্রহ? অর্থনীতিবিদ ও খোদ ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বিনিয়োগ খরা রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত কারণগুলো হলো উচ্চ সুদ হারের চাপ, জ্বালানি, অবকাঠামো সংকট, ডলারের অস্থিরতা, বিদেশি ঋণের ভয়, আস্থার সংকট ও নীতিগত ধীরগতি। উচ্চ সুদহারের চাপ: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার দফায় দফায় বাড়িয়েছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদহার প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। এতো উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে প্রকল্প চালানো লাভজনক হবে না ভেবে ব্যবসায়ীরা পিছু হটছেন। জ্বালানি ও অবকাঠামো সংকট: গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা নতুন বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায়। ডলারের অস্থিরতা ও বিদেশি ঋণের ভয়: অতীতে বিদেশি বায়ার্স ক্রেডিট বা স্বল্পমেয়াদি ঋণ ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দিলেও, ডলারের দামের লাগামহীন ওঠানামায় এখন তা ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতে নেওয়া কম সুদের বিদেশি ঋণ শোধ করতে গিয়ে এখন বাড়তি টাকার অবমূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যার কারণে নতুন করে কেউ বিদেশি ঋণের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। আস্থার সংকট ও নীতিগত ধীরগতি: সরকার পরিবর্তনের পর ব্যবসায়িক পরিবেশের আমূল সংস্কারের ঘোষণা এলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ধীর। বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই এখন ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। নীতি-নির্ধারকদের জরুরি করণীয় বর্তমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কাজনক পূর্বাভাস থেকে দেশকে রক্ষা করতে দেশের নীতি-নির্ধারক (অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিডা) দ্রুত কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে, ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয় ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর রূপান্তর। ব্যবসায়িক আস্থার পুনরুদ্ধার: প্রথম ও প্রধান কাজ হলো উদ্যোক্তাদের আশ্বস্ত করা। বিনিয়োগের জন্য একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল রাজনৈতিক ও আইনি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক কারণে বা ঢালাওভাবে যেন কোনো সচল ব্যবসায়ী বা শিল্প বন্ধ না হয়, সেই বিষয়ে সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদন সচল না থাকলে ঋণের চাহিদা তৈরি হবে না। মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির সমন্বয়: শুধু সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে গিয়ে বিনিয়োগ যেন পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে এসএমই ও রপ্তানি খাতের জন্য বিশেষায়িত কম সুদের ঋণের ব্যবস্থা বা পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু রাখা প্রয়োজন। ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের কার্যকর রূপান্তর: বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত ও সহজ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ার অর্থ হলো দেশের কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় ধাক্কা লাগা। ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফেরানোর পাশাপাশি এখনই যদি করপোরেট ও বেসরকারি খাতে আস্থার সংকট দূর করা না যায়, তবে এই বিনিয়োগ খরা আগামীতে কর্মসংস্থানহীন এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দার রূপ নিতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় নীতি সুদের হার আগের চেয়ে বেশি রয়েছে। তাই এখন ঋণ প্রবৃদ্ধি হঠাৎ করে বাড়ানোও তুলনামূলকভাবে কঠিন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে, না হলে নীতি সুদের হার কমানো সম্ভব হবে না। কারণ সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করা যাবে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে। ফাহমিদা খাতুন বলেন, নির্বাচিত সরকার আসার পরও নতুন ব্যবসা করার জন্য ব্যবসায়ীরা আস্থা পাচ্ছেন না। এছাড়া দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সমস্যা এখন আবার প্রকট হয়ে উঠেছে। অবকাঠামোগত সমস্যা বলতে শুধু রাস্তাঘাট, বন্দর কিংবা সেতু নয়; জ্বালানির দামও অনেক বেড়েছে। আবার অনেক কারখানা বেশি দাম দিয়েও জ্বালানি পাচ্ছে না। ফলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বাড়ছে। ব্যাংকারদের মতে, ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত তহবিল আছে, কিন্তু ঋণের যোগ্য ও সাহসী উদ্যোক্তার অভাব দেখা দিয়েছে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে যৌথভাবে একটি বিশেষ ‘বিনিয়োগ চাঙ্গা করার টাস্কফোর্স’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব আলী মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি আসার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, চাহিদা অনেক কমে গেছে। চাহিদা কম থাকার কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহারও কমে গেছে। যেহেতু বিভিন্ন খাতে বাজারে এখনো যথেষ্ট অব্যবহৃত সক্ষমতা রয়েছে, তাই চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে নতুন সক্ষমতা তৈরির জন্য বড় বিনিয়োগের প্রয়োজনও এখনই তৈরি হচ্ছে না। এই ধরনের বিনিয়োগ বাড়তে হয়তো আরও এক বছর সময় লাগতে পারে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, বর্তমানে দেশের বড় শিল্পগ্রুপগুলোর অনেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন কমিয়েছে, ফলে তাদের ব্যাংকঋণের প্রয়োজনও কমেছে। তিনি বলেন, দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের সংকট চলছে। পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে নানা অনিয়মের কারণে বর্তমানে ১৫টির কিছু বেশি ব্যাংকের অবস্থা ভালো থাকলেও বাকিগুলোর আর্থিক অবস্থা দুর্বল। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতাও আগের তুলনায় কমেছে। ঋণের চাহিদা বাড়লেও অনেক ব্যাংক আগের মতো ঋণ দিতে পারবে না। তার মতে, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হবে, না হলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে না।