এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কোথায় কী ঘটছে?
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তাসংস্থা এএফপি। প্রবালপ্রাচীর ও বনাঞ্চলে বাড়তি ঝুঁকি জাতিসংঘের প্রকৃতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ডেভিড ওবুরা এএফপিকে বলেন, চলতি বছরের এল নিনো বিশ্বের প্রবালপ্রাচীরগুলোর জন্য ‘ভয়াবহ মাত্রায় বাড়তি ঝুঁকি’ তৈরি করছে। প্রবালগুলো তাপমাত্রার পরিবর্তনে অত্যন্ত সংবেদনশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রবালের বিবর্ণ হয়ে যাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে। স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বড় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালের সর্বশেষ বৈশ্বিক জরিপের পর প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতিগুলোর অবস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। পর্যালোচনাটিতে নেতৃত্ব দেন ওবুরা। বনাঞ্চলও ঝুঁকিতে রয়েছে। স্বাধীন সংস্থা ফরেস্ট ডিক্লারেশন অ্যাসেসমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে বন উজাড়ের হার কমেছিল। তবে মধ্য আফ্রিকার পরিস্থিতির অবনতি এবং এল নিনোর কারণে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায় এ অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। এল সালভাদরে গবাদিপশুর দুর্দশা এল নিনোর প্রভাবে মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো থেকে পানামা পর্যন্ত বিস্তৃত ‘ড্রাই করিডর’ অঞ্চলে তীব্র খরা দেখা দিয়েছে। এএফপির সংবাদকর্মীরা এল সালভাদরের সেনসুনতেপেকে একটি গবাদিপশুর বাজারে গিয়ে দেখেছেন, খাবারের অভাবে গরুগুলোর পাঁজরের হাড় বেরিয়ে এসেছে। ৫৪ বছর বয়সী খামারি আন্তোনিও আগুইলার একটি গরুর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘দেখুন, ছোট প্রাণীটি কত শুকিয়ে গেছে! কেন? কারণ ঘাস নেই।’ বছরের শেষ দিকে এল নিনোর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় এল নিনোর প্রভাবও তীব্র হচ্ছে। বায়ুমণ্ডল উষ্ণ হলে মাটি দ্রুত শুকিয়ে খরা বাড়ে। একইসঙ্গে উষ্ণ বায়ুমণ্ডল বেশি জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে, ফলে বৃষ্টিপাত আরও তীব্র হতে পারে। দারিদ্র্য বাড়ার আশঙ্কা জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক প্রধান আলেক্সান্ডার ডি ক্রু এএফপিকে বলেন, এল নিনোর সঙ্গে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও উচ্চ সুদের হার যুক্ত হলে লাখো মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন। বিশেষ করে একের পর এক সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী বেশি বিপদে পড়বে। তিনি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে তা মোকাবিলায় বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পর দেশটি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এরপর আগামী বছরের শুরুর দিকে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে। এল নিনোর তীব্রতা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মত এল নিনোর তীব্রতা কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে এটি কতটা শক্তিশালী বলে বিবেচিত হবে। বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন পদ্ধতির কারণে আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও কঠিন। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর একে ‘নজিরবিহীন’ বলেছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার মতে, পর্যবেক্ষণ করা ঘটনাগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাসদাতারা এখনো একে রেকর্ড গড়া ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করেননি। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী এমিলি বেকার বলেন, ‘যে পদ্ধতিতেই মাপা হোক, আমরা খুব শক্তিশালী একটি এল নিনো দেখছি।’ তবে ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এর অবস্থান কোথায়, তা বোঝা যাবে ঘটনাটি শেষ হওয়ার পর। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের সব মহাসাগর উষ্ণ হচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) এখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব-মধ্যাঞ্চলের তাপমাত্রার সঙ্গে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের বাকি অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য বিবেচনা করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পার্থক্য বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ওপর এল নিনোর প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংখ্যায় এল নিনো ৪ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস: এএফপির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগস্টে এল সালভাদরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কপারনিকাস স্যাটেলাইট, ভূ-পৃষ্ঠের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকেন্দ্র ও মডেলভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এ হিসাব করা হয়েছে। পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সুবিধা না থাকায় অনেক দেশ নিজেদের বিস্তারিত জলবায়ু-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করতে পারে না। ১৯৮২ সাল এনওএর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮২ সালে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা গিয়েছিল। চলতি বছরের ঘটনাটি সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ৪৪ শতাংশ সর্বশেষ বৈশ্বিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রবালপ্রাচীর গঠনকারী প্রজাতির ৪৪ শতাংশ অংশ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এরপর চতুর্থ বৈশ্বিক প্রবাল বিবর্ণতার ঘটনা ও চলতি বছরের এল নিনো প্রবালপ্রাচীরের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা এনওএর নতুন সূচক অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় সমুদ্রের অন্যান্য অংশের তুলনায় ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলে এবং এ পার্থক্য টানা তিন মাস বজায় থাকলে, সেটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। তাপমাত্রার এই পার্থক্য সামান্য মনে হলেও এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ইএনএসও) প্রতি বছর বিশ্বের জলবায়ুর পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক কারণ। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহাসাগরের কোথায় তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে, তার পরিবর্তন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলে। এতে কোথাও তাপমাত্রা কমে ও বৃষ্টি বাড়ে, আবার অন্য কোথাও তাপমাত্রা বাড়ে এবং খরা তীব্র হয়। দূরবর্তী অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ ধরনের প্রভাবকে ‘টেলিকানেকশন’ বলা হয়। তবে এল নিনো ও এর বিপরীত অবস্থা লা নিনা বিশ্বজুড়ে নির্দিষ্ট ধরনের আবহাওয়া তৈরির সম্ভাবনা বাড়ালেও তা নিশ্চিত করে না। লা নিনার সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে।- সূত্র এএফপি কেআর/