Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হচ্ছে লাখো মানুষ
চিকিৎসা করাতে গিয়ে দরিদ্র হচ্ছে লাখো মানুষ

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এই গবেষণায় সহায়তা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও সুইডিশ দূতাবাস। বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০৫, ২০১০, ২০১৬ ও ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে মানুষ নিজের পকেট থেকে কতটা ব্যয় করছে, কোন খাতে খরচ হচ্ছে এবং সেই ব্যয় পরিবারের আর্থিক অবস্থায় কী প্রভাব ফেলছে, তা বিশ্লেষণ করাই ছিলো গবেষণার উদ্দেশ্য। চিকিৎসার ব্যয়ে বাড়ছে আর্থিক চাপ গবেষণায় দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে মানুষের আর্থিক সংকট বেড়েছে। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপে ছিলেন ২৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৭ শতাংশে। গবেষণা উপস্থাপনার শুরুতে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল বলেন, দেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৫ সালে দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র ছিলো। ২০২২ সালে এই হার কমে দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপে পড়া মানুষের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ২০২২ সালে শুধু স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে ৭২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তির নিজের পকেট থেকে খরচ করার প্রবণতা এই পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। চিকিৎসার খরচ মেটান ৯৩ শতাংশ মানুষ গবেষণায় চিকিৎসার জন্য নিজের পকেট থেকে খরচ করা মানুষের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০৫ সালে ৫২ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ চিকিৎসার জন্য নিজস্ব অর্থ ব্যয় করত। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে হয়েছে ৯২ দশমিক ৭ শতাংশ। চিকিৎসার জন্য একটি পরিবারের গড় নিজস্ব ব্যয়ও বেড়েছে। ২০০৫ সালে একটি পরিবারের এই ব্যয় ছিলো ৭০৯ টাকা। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৪৯৩ টাকায়। গবেষণায় ব্যক্তির নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যয়ের মোট পরিমাণ নির্ণয় করা হয়নি। তবে কত মানুষ নিজের পকেট থেকে চিকিৎসার খরচ মেটায় এবং কোন খাতে কত ব্যয় করে, তার হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। ওষুধ কিনতেই ব্যয়ের বড় অংশ চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হচ্ছে ওষুধ কেনা ও রোগনির্ণয়ে। ২০২২ সালের হিসাবে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মোট ব্যয়ের ৭৪ শতাংশ গেছে ওষুধের পেছনে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ। রোগনির্ণয়েও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয় রোগীদের। বহির্বিভাগের রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের ১১ শতাংশ এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিজস্ব ব্যয়ের ২২ শতাংশ ব্যয় হয় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ, হাসপাতালে থাকা ও যাতায়াতের পেছনেও অর্থ খরচ হয়। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বেশি ব্যয়বহুল গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচের পার্থক্যও উঠে এসেছে। ২০২২ সালে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া একজন রোগীর গড় নিজস্ব ব্যয় ছিলো ২ হাজার ৬৮৮ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে এই ব্যয় ছিলো ৪ হাজার ৮০৮ টাকা। হাসপাতালে ভর্তি হলে খরচের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর গড় ব্যয় ছিলো ২১ হাজার ৫৪৭ টাকা। বেসরকারি হাসপাতালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ হাজার ৫১৭ টাকায়। এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর গড় ব্যয় ছিলো ২২ হাজার ২৮ টাকা। গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ৮ দশমিক ১ শতাংশ হাসপাতালে ভর্তি হতো। ২০২২ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৪ শতাংশে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সঙ্গে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। আয় বাড়লেও স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে দ্রুত চিকিৎসার ব্যয়ে আর্থিক চাপ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো আয়ের তুলনায় স্বাস্থ্য ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়া। গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরিবারের আয় বেড়েছে ৩৮ শতাংশ। একই সময়ে স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমে ফার্মেসির ওপর মানুষের নির্ভরতা বেড়েছে। ২০১৬ সালে চিকিৎসার জন্য ১৫ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতাল বেছে নিতো। ২০২২ সালে এই হার কমে হয়েছে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। বিপরীতে, ফার্মেসি থেকে চিকিৎসাসেবা নেওয়া বা ওষুধ সংগ্রহের হার ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিও স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ বাড়াচ্ছে। ২০০৫ সালে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত মানুষের হার ছিলো ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে ওষুধ সেবন ও নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় এসব রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। দরিদ্র ও গ্রামীণ মানুষ বেশি বিপাকে চিকিৎসার ব্যয়ের চাপ দেশের সব শ্রেণি ও অঞ্চলের মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে ধনী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই হার ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে বেশি আর্থিক সংকটে পড়ছেন। গ্রামীণ মানুষের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। বিভাগভিত্তিক হিসাবে, ২০০৫ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক চাপে থাকা মানুষের হার সবচেয়ে বেশি ছিলো রাজশাহী বিভাগে, আর সবচেয়ে কম ছিলো বরিশালে। ২০২২ সালে চিত্র বদলে যায়। তখন বরিশাল বিভাগে এই হার ছিলো সবচেয়ে বেশি এবং ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে কম। গবেষকদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ালেই যে দরিদ্র মানুষের কাছে তার সুফল পৌঁছাবে, তা নিশ্চিত নয়। স্বাস্থ্যসেবায় আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যয়ের চাপ কোন শ্রেণির মানুষের ওপর বেশি পড়ছে, তা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। গবেষণার ফল নিয়ে যা বললেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, উপস্থাপিত ফলাফল দেশের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থার একটি চিত্র। ২০০৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রথম দিকে বিএনপি ক্ষমতায় ছিলো এবং বাকি সময়ে ক্ষমতায় ছিলো ফ্যাসিস্ট সরকার। তার ভাষ্য, গবেষণায় উঠে আসা পরিস্থিতির দায় বিএনপি সরকারের ওপর বর্তায় না। /শান্ত/