Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

অক্টোবরেই কেন একসঙ্গে এতো কাশফুল ফোটে?
অক্টোবরেই কেন একসঙ্গে এতো কাশফুল ফোটে?

আখের বুনো আত্মীয় এই কাশের বৈজ্ঞানিক নাম Saccharum spontaneum। এই ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই জন্মায়। মাটির নিচে রাইজোম নামে এর একধরনের কাণ্ড ছড়িয়ে থাকে যা দেখতে শিকড়ের মতো হলেও আসলে কাণ্ড। এটি মাটির নিচে চারদিকে বাড়তে থাকে। নদীর চর বা খোলা জমিতে একবার কাশ জন্মালে ধীরে ধীরে বড় ঝাড় তৈরি হয়। কাশের কাণ্ড সাধারণত দুই থেকে চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়, কখনো আরও বেশি। বিজ্ঞানীরা বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে কাশের ফুল ফোটার একটা সম্পর্ক আগেই লক্ষ করেছিলেন। শরতে আমরা যে সাদা কাশবন দেখি, তার প্রস্তুতি শুরু হয় আরও আগে। বর্ষার কয়েক মাস ধরে কাশগাছ বেড়ে ওঠে। নতুন কাণ্ড বের হয়, পাতা বাড়ে, মাটির নিচের রাইজোমও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গাছ যথেষ্ট পরিণত হলে একসময় কাণ্ডের মাথায় ফুল তৈরির কাজ শুরু হয়। এতদিন যে অংশ থেকে নতুন পাতা আর কাণ্ড তৈরি হলোচ্ছিল, সেখানেই এবার ধীরে ধীরে ফুলের গুচ্ছ তৈরি হতে থাকে। তবে সেই ফুল বাইরে থেকে দেখা যেতে আরও কিছুদিন সময় লাগে। বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার জন্য কিছু কাশ কোয়েম্বাটুর থেকে অনেক উত্তরের কারনালে নিয়ে পরীক্ষা করেন। জায়গা বদলানোর সঙ্গে ফুল ফোটার সময়ও বদলে যাচ্ছিলো। উত্তরের দিকে ফুল আসছিলো দেরিতে, দক্ষিণের দিকে আগে। গবেষকেরা হিসাব করেন, গাছগুলো নিজেদের আদি জায়গায় থাকলে আনুমানিক কখন ফুল দিত। টানা ৩ মৌসুম পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, সব কাশ একই সময়ে ফুল দেয়নি। কোনোটায় ফুল এসেছে আগে, কোনোটায় পরে। তবে সবচেয়ে বেশি ফুল পাওয়া গেছে অক্টোবর মাসেই। কাশের ফুল আসার সময়ের সঙ্গে বর্ষা শেষ হওয়ার এই মিলের পেছনে দিনের দৈর্ঘ্যেরও বড় ভূমিকা আছে। অবাক বিষয় হচ্ছে দিনে কতক্ষণ আলো থাকছে, রাত কতটা লম্বা হচ্ছে, সেই পরিবর্তন অনেক গাছই বুঝতে পারে। দিন-রাতের দৈর্ঘ্য বদলালে গাছের শরীরে যেমন তার প্রভাব পড়ে, তেমনি ফুল ফোটার সময়ও বদলে যেতে পারে। এই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ফটোপিরিয়ডিজম। দিনের দৈর্ঘ্যের এই হিসাব বাংলাদেশের শরতের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিলে যায়। তবে দিন ১২ ঘণ্টার নিচে নামল আর সঙ্গে সঙ্গে কাশফুল ফুটে গেলো, হিসাবটা এত সহজ নয়। ফুল তৈরির আগের কয়েক সপ্তাহে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য কীভাবে বদলেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি তাপমাত্রা, পানি, আর্দ্রতা এবং গাছ কতটা পরিণত হয়েছে, সেসবেরও প্রভাব আছে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা FT3 নামে এমনই একটি জিনের দিকে বিশেষভাবে নজর দেন। দিনের দৈর্ঘ্য বদলানোর সঙ্গে কাশগাছে এই জিনের সক্রিয়তাও বদলাতে দেখা যায়। অর্থাৎ গাছটি কখনো এই জিনের তথ্য বেশি ব্যবহার করছে, কখনো কম। চাষের আখের তুলনায় বুনো কাশে জিনটি বেশি সক্রিয় ছিলো। একই কাশবনে অনেক কাণ্ডে কাছাকাছি সময়ে ফুল ফোটার পেছনেও এসবের ভূমিকা থাকতে পারে। পাশাপাশি থাকা কাশগাছগুলো প্রায় একই দৈর্ঘ্যের দিন, একই বৃষ্টি আর একই তাপমাত্রা পায়। আবার মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা একটি রাইজোম থেকেই অনেকগুলো কাণ্ড বের হতে পারে। অর্থাৎ একই ঝাড়ের অনেক কাণ্ড আসলে একই গাছের অংশ হতে পারে। এসব কারণে তাদের ফুল আসার সময়ও কাছাকাছি হতে পারে। তার মানে সব কাণ্ডে একই দিনে ফুল ফোটে, তা নয়। আগে পরেও ফোটে থাকে। কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাশে এত বেশি ফুল আসে যে আমাদের চোখে মনে হয়, পুরো সবুজ মাঠটা যেন হঠাৎ করেই সাদা হয়ে গেছে। কাশের কাণ্ডের মাথায় থাকা ফুলমঞ্জরির শাখাগুলোয় অসংখ্য ছোট ছোট ফুল থাকে। ফুলগুলোর গোড়ায় থাকে রেশমের মতো মিহি সাদা লোম। এই সাদা রঙের পেছনে আছে ফুলমঞ্জরির বিশেষ গঠন। কাণ্ডের মাথায় থাকা ফুলমঞ্জরি ২৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। লোম শুধু কাশবনকে সুন্দর দেখাতেই নয়, বীজ ছড়াতেও সাহায্য করে। বীজ পেকে গেলে লোমযুক্ত হালকা অংশগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বীজও পৌঁছে যায় দূরের কোনো জায়গায়। তবে কাশ শুধু বীজের ওপর নির্ভর করে না। মাটির নিচের রাইজোম, এমনকি কাণ্ডের টুকরা থেকেও নতুন গাছ জন্মাতে পারে। অক্টোবরের মাঝামাঝি আমরা যে সাদা কাশবন দেখি, সেটা শরতের কয়েক দিনে তৈরি হয়নি। বর্ষার কয়েক মাস ধরে গাছ বেড়ে উঠেছে, দিন ধীরে ধীরে ছোট হয়েছে। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাছের ভেতরেও চলেছে ফুল তৈরির প্রস্তুতি। /শিউলী/