আলবেনিয়ায় বিক্ষোভ দমনে জরুরি ডিক্রি, উপস্থিত থাকলেই জরিমানা
দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামার সরকার বুধবার (২৮ অক্টোবর) এই বিতর্কিত জরুরি আইনি পদক্ষেপ অনুমোদন করে, যা দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হয়েছে। নতুন এই বিধানের সবচেয়ে কঠোর দিক হলো, বিক্ষোভে উপস্থিত কেউ নিজে সরাসরি কোনো ভাঙচুর বা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকলেও সমান শাস্তির আওতায় আসবেন। যদি কোনো ব্যক্তি জনসমক্ষে সহিংসতা বা লুটপাট চালানো জনতার মধ্যে অবস্থান করেন কিংবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার চোখ এড়াতে নিজের পরিচয় গোপন বা মুখাবরণ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন, তবে তাঁকেও এই বিশাল অঙ্কের জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। আলবেনিয়ায় বর্তমানে কর-পূর্ব গড় মাসিক বেতন মাত্র ৯৩০ ইউরো। সেই তুলনায় এই জরিমানার অঙ্ক সাধারণ মানুষের মাসিক আয়ের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ বেশি, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের নাগরিকদের ওপর একটি চরম আর্থিক বোঝা তৈরি করবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। সরকারি এই জরুরি ডিক্রিটি ইতিমধ্যেই কার্যকর করা হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে বহাল রাখতে আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে দেশের পার্লামেন্টের চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে। নতুন ব্যবস্থার আওতায় দেশটির স্টেট পুলিশকে বিশেষ ও ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সহিংসতার সামান্য আশঙ্কা বা ইঙ্গিত থাকলেই তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গণপরিবহণ টার্মিনাল, বন্দর, বিমানবন্দর এবং সরকারি দপ্তরের আশপাশসহ নির্দিষ্ট যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাময়িকভাবে সমাবেশ সীমিত বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে পারবে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইমেইল বা অনলাইনের মাধ্যমে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া এবং বিভ্রান্তি ছড়ানোর বিরুদ্ধেও নতুন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে, বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার একটি বিশেষ স্কিমও চালু করেছে রামা সরকার। প্রধানমন্ত্রী এদি রামা জানিয়েছেন, ফ্রান্সের একটি প্রস্তাবিত আইন থেকে তিনি এই ব্যতিক্রমী আর্থিক শাস্তির ধারণা পেয়েছেন। ফরাসি পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষে সম্প্রতি পাস হওয়া ওই আইন অনুযায়ী, রাজপথে বিক্ষোভের ফলে সৃষ্ট যেকোনো রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি ক্ষয়ক্ষতির জন্য বিক্ষোভকারীদের সামষ্টিক ও আর্থিকভাবে দায়ী করার বিধান রাখা হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে আলবেনিয়ার একটি পরিবেশগতভাবে সুরক্ষিত এলাকায় বিলাসবহুল হোটেল ও আন্তর্জাতিক পর্যটন রিসোর্ট নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীদের একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিলো। এই বহু বিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল প্রকল্পের পেছনে প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং কন্যা ইভানকা ট্রাম্প। সজান দ্বীপ ও জর্নেক অঞ্চলের সুরক্ষিত জলাভূমিতে এই প্রকল্প নির্মাণের ফলে সামগ্রিক পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে এবং বিশেষ করে ওই অঞ্চলের পরিযায়ী রাজহাঁস বা ‘ফ্ল্যামিঙ্গো’ পাখির প্রাকৃতিক আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে বলে অভিযোগ করেন বিক্ষোভকারীরা। এই কারণেই এই আন্দোলনটি পরবর্তীতে ‘ফ্ল্যামিঙ্গো রেভল্যুশন’ বা রাজহাঁস বিপ্লব নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায়। শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই আন্দোলন গত অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ব্যাপক সহিংস রূপ নেয়। এটি তখন কেবল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি বৃহত্তর সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়। দেশের প্রায় ২৩ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ, সরকারি খাতের ব্যাপক দুর্নীতি, ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থানের চরম অভাবের বিরুদ্ধে হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজধানী তিরানার রাজপথে নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীরা ২০১৩ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করলে পুলিশের সঙ্গে তাদের দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীরা বেশ কয়েকটি সরকারি ভবনে হামলা চালান ও আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যাপকভাবে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে, যার ফলে শত শত পুলিশ সদস্য এবং আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন এবং অনেককে আটক করা হয়। বিক্ষোভের তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং আন্দোলনকারীদের সাথে কোনো প্রকার সংলাপে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি এই দেশব্যাপী সহিংসতার পেছনে একটি ‘বিদেশি শক্তির’ হাত রয়েছে বলে বারবার দাবি করে আসছেন। রামা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন, অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এবং দেশের তরুণদের উসকে দেওয়ার পেছনে রাশিয়া ও ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তবে কঠোর দমনপীড়নের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংকট নিরসনে তিনি এখনও শর্তসাপেক্ষে সংলাপের দরজা খোলা রাখার কথা বলছেন। /এমএএইচ/