শহরে ঘর জোটানো কঠিন, সংকটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের নগরাঞ্চলে বসবাসকারীর সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩ কোটি। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাত কোটিতে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে আবাসন ঘাটতি প্রায় ৬০ লাখ ইউনিট। ২০৩০ সাল নাগাদ তা বেড়ে ১ কোটি ৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসনের। অথচ বছরে নির্মিত হচ্ছে মাত্র ৩১ হাজার ৫০০ ইউনিট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, দেশে বস্তিতে বসবাস করেন প্রায় ১৭ লাখ ৩৬ হাজার মানুষ। পর্যাপ্ত আবাসনের অভাব, অনিরাপদ ভূমি অধিকার ও অসহনীয় বাড়িভাড়ার কারণে বস্তির বাইরেও বহু পরিবার আবাসন অনিশ্চয়তায় রয়েছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় সংকটের প্রভাব বেশি। কর্মস্থলের কাছাকাছি বাসা অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। ফলে অনেককে শহরের প্রান্তে কিংবা অপরিকল্পিত বসতিতে থাকতে হচ্ছে। এতে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি পানি, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সুবিধাও নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আবাসন সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি। অপরিকল্পিত বসতিগুলোর অনেকগুলোই জলাবদ্ধতা, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ও কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবও বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নগর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নগর পুনরুজ্জীবন: সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। জাতিসংঘের মানববসতি কর্মসূচি (ইউএন-হ্যাবিট্যাট) ঘোষিত এই প্রতিপাদ্যে পুরনো নগর এলাকার উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন বৃদ্ধি এবং নগর উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, আবাসন কেবল মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়; বৈষম্য মোকাবিলা ও টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার অন্যতম ভিত্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন সংকট মোকাবিলায় নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি বিদ্যমান নগর এলাকার পরিকল্পিত ব্যবহার জরুরি। অব্যবহৃত জমি ও পুরনো আবাসিক এলাকা কাজে লাগানো, গণপরিবহন ও নাগরিক সেবার উন্নয়ন এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। বস্তি উচ্ছেদকে একমাত্র সমাধান না ভেবে সেখানকার পরিবেশ, পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বাসিন্দাদের আবাসন নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও সাশ্রয়ী আবাসন অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি। তবে নতুন আবাসন প্রকল্পের ব্যয় যেন প্রকৃত চাহিদাসম্পন্ন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব নগর দিবসের মূল বার্তা হলো, নগর উন্নয়ন মানে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ নয়। বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী বাসস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাই টেকসই নগরায়ণের অন্যতম শর্ত। /শান্ত/