Advertisement(970X90).png
Advertisement(300X90).png

১৫ কার্তিক ১৪৩৩, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৮, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

পরিবেশ ইস্যুতে ইইউ থেকে ইস্পাত আমদানিতে বাদ পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ
পরিবেশ ইস্যুতে ইইউ থেকে ইস্পাত আমদানিতে বাদ পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ

ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বর্জ্য নীতিমালায় সংকটে পড়তে পারে বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প। এখনই এ ব্যাপারে কূটনৈতিক পর্যায়ে উদ্যোগ না নিলে দেশের ইস্পাত শিল্পে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও কাঁচামাল সরবরাহের সংকট দেখা দিতে পারে। জানা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) -এর বর্জ্য পরিবহন-সংক্রান্ত খসড়া নীতিমালায় বাংলাদেশের আমদানিযোগ্য পণ্যের তালিকা থেকে ধাতব বর্জ্য বাদ দেওয়া হয়েছে। খসড়া তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইইউ থেকে কাগজ ও রাবার বর্জ্য আমদানির অনুমোদন পেলেও ধাতব বর্জ্যের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ রাখা হয়নি। চূড়ান্ত তালিকায়ও যদি এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে, তবে নতুন ব্যবস্থার আওতায় ২০২৭ সালের ২১ মে থেকে ইইউভুক্ত দেশ থেকে ফেরাস স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, চাহিদা হ্রাস ও ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের কারণে দেশের ইস্পাত উৎপাদনকারীরা আগে থেকেই কঠিন সময় পার করছেন। এমন পরিস্থিতিতে এই সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে এলো। বিলেট ও রিইনফোর্সিং বার উৎপাদনের জন্য এই খাত আমদানিকৃত স্ক্র্যাপের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে কাঁচামালের এত বড় একটি উৎস হারালে খাতটিতে কাঁচামালের খরচ ও ইস্পাতের দাম দুটিই বেড়ে যেতে পারে। খসড়া তালিকাটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তাই চলমান পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধাতব বর্জ্য আমদানির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শিল্প বিশ্লেষক এবং জাগুয়ার রিসোর্স অ্যান্ড ক্যাপিটাল প্রাইভেট লিমিটেডের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ইফতেখার আহমেদ জানান, ঐতিহাসিকভাবেই ইইউ বাংলাদেশের জন্য ইস্পাত স্ক্র্যাপের একটি প্রধান উৎস। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশে মোট আমদানিকৃত স্ক্র্যাপের ৬০ শতাংশেরও বেশি আসত ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ইইউ থেকে ইস্পাত স্ক্র্যাপ আমদানি কিছুটা কমলেও, দীর্ঘ মেয়াদে তালিকা থেকে বাদ পড়ায় বাংলাদেশের বাজারে স্ক্র্যাপের দামের ওপর প্রভাব পড়বে।' বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সুমন চৌধুরী বলেন, 'ইউরোপের বাজার থেকে স্ক্র্যাপ আমদানির সুযোগ হারালে এই শিল্প আরেকটি নতুন সংকটে পড়বে। এতে ইস্পাতপণ্যের দাম আরও বেড়ে যাবে, যা বাজারে পণ্য বিক্রি করাকে আরও কঠিন করে তুলবে।' কারণ পরিবেশগত ইস্যু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সংশোধিত বর্জ্য পরিবহন কাঠামোর আওতায় এই সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি এসেছে। রেগুলেশন (ইইউ) ২০২৪/১১৫৭ নামের এই নতুন বিধিমালাটি ২০২৪ সালের ২০ মে থেকে কার্যকর হয়েছে। এই কাঠামোর আওতায়, ওইসিডি-বহির্ভূত দেশগুলো (যেসব স্বাধীন রাষ্ট্র বা অঞ্চল অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সদস্য নয়) কেবল ইউরোপীয় কমিশনের তালিকায় তাদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে অনুমোদিত বর্জ্যই আমদানি করতে পারবে। এই অনুমোদন পেতে আগ্রহী দেশগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা পরিবেশবান্ধব উপায়ে সংশ্লিষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে সক্ষম। ইইউ থেকে নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিহীন বর্জ্য আমদানির যোগ্যতা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আবেদন জমা দেয়। কমিশন দেখতে পেয়েছে, কাগজ ও রাবার বর্জ্য আমদানির শর্তগুলো বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে। কিন্তু পরিবেশবান্ধব উপায়ে ধাতব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকার প্রমাণ বাংলাদেশ দিতে পারেনি। ধাতব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান নির্গত হতে পারে। এছাড়া পর্যাপ্ত সুরক্ষাব্যবস্থা না থাকলে এসব ধাতু টুকরো করা (শ্রেডিং), গলানো (স্মেল্টিং) পরিশোধনের সময় পরিবেশ দূষণ ঘটতে পারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫.২৯ মিলিয়ন টন ফেরাস স্ক্র্যাপ আমদানি করা হয়েছে। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ১ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ দেশের মোট ৬.২৯ মিলিয়ন টন জোগানের প্রায় ৮৪ শতাংশই এসেছে আমদানির মাধ্যমে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হলে পরিবেশগত শর্তাবলি পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইস্পাত উৎপাদনকারীরা যদি এসব সমস্যার সমাধান করতে পারেন এবং সরকার যদি জোরালো উদ্যোগ নেয়, তবে স্ক্র্যাপ ইস্পাত আমদানির তালিকায় বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এজন্য শিল্প খাতের উদ্যোক্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের একযোগে কাজ করতে হবে।' বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (এফটিএ-২) মাহবুবা খাতুন মিনু বলেন, 'তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমরা ইতিমধ্যে আবেদন জমা দিয়েছি। আবেদনটি এখন পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত করার পর আমরা পরবর্তী আলোচনা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেব।' এক প্রশ্নের জবাবে মিনু জানান, দেশের পরিবেশগত মানদণ্ড পরিপালনের বিষয়টি নিয়ে ইউরোপীয় কমিশন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। শুধু বাংলাদেশই এই তালিকা থেকে বাদ পড়েনি। ভারত, পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশও তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।' ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ অনুমোদিত গন্তব্য দেশগুলোর প্রথম তালিকা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে ইউরোপীয় কমিশনের। আর নতুন এই নিয়ম কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের ২১ মে থেকে। তখন ওইসিডি-বহির্ভূত দেশগুলো কেবল অনুমোদিত খাতের বর্জ্যই আমদানি করার অনুমতি পাবে। ইস্পাত শিল্পের ওপর প্রভাব ইস্পাত কারখানাগুলো ফেরাস স্ক্র্যাপ ব্যবহার করে বিলেট তৈরি করে। পরে তা প্রক্রিয়াজাত করে রিবার ও অন্যান্য ইস্পাতপণ্য উৎপাদন করা হয়। স্ক্র্যাপের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এর ফলে উৎপাদনকারীরা হয় পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়াতে বাধ্য হবে, নয়তো তাদের মুনাফার মার্জিন কমিয়ে আনতে হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএমের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত বলেন, ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে আসা স্ক্র্যাপ ইস্পাতের মান বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে ভালো। ইইউ যদি বাংলাদেশে স্ক্র্যাপ ইস্পাত পাঠানো বন্ধ করে দেয়, তবে দেশের ইস্পাত শিল্প বড় বিপদে পড়বে। তিনি বলেন, ‘এতে স্ক্র্যাপ ইস্পাতের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উৎপাদনকারীরাও রিবার ও অন্যান্য ইস্পাতপণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হবে।' /কেআর/এমএএইচ/